
১
সন্ধ্যার পর রাতটা ঝুপ করে নামে, যেন একটা কালো ঝাঁকি জাল ছুঁড়ে মারা হয়েছে চাঁদের উপর তাই ঐ পাশের গজঘন্টা, হাবু, গান্নার পাড় জুড়ে নামছে অখণ্ড অন্ধকার। জাহানারার চোখ আর কান সজাগ হয়ে যায়। মাটি থেকে ফণা তোলা কুয়াশা তার শন হওয়া চুলে কামড় বসায়। তার কণ্ঠ খসখসে শোনায়। প্রথম প্রথম সেতারার গা কাটা দিত।
এমন কত পূর্নিমা, অমাবস্যা, শীত কি গ্রীষ্ম প্রতিটা রাত গাছটার কাছে জাহানারার কথা যেন শেষ হয় না। দিন যায় তার কথা জড়ায় জড়ায় কেবল গোঙানি হয়ে যায়। স্বরের উঠানামা না থাকলে সেটারে মনুষ্য কিছু মনে হতো না।
জাহানারার মনে হয় গোরস্তানটা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। জাহানারার আরো অনেককিছু মনে হয়। তার জড়িয়ে যাওয়া স্মৃতিতে জট পাকায় এক কুটিল অস্পষ্টতা। সে বসে পড়ে। মেঘ থেকে চাঁদ বের হয়, কিন্তু শীতের শাসনে আলোর বিস্তারপ্রবণ চপল প্রবাহ জমে বরফ হয়ে চাঁদেই বন্দী থাকল।
সেতারার ছেলে বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসে। সেতারা চোখ খুলে তাকায়। তার এই সাতবছরের ছেলেটা একটু অন্যরকম। মায়ের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় বলে, “দাদী মারা যাবে মা আজকে”। ছেলেটা এমনিতেই কথা কম বলে। তার চলাফেরা ইতোমধ্যেই মায়ের মধ্যে সম্ভ্রম জাগাতে পারছে। তার বলার গভীরতায় সেতারা উঠে বসে।
২
জাহানারার জন্যই এই বাড়িটা বানিয়েছে তার স্বামী আবদুল লতিফ। জাহানারারা কয় ভাইবোন সে তা মনে করতে পারে না। তার কেবল তার বাবার কথা মনে আছে। জাহানারা তার ভাই বোন গুণে দেখার বয়সে পড়ার আগেই, এক বিশাল ছাতিওয়ালা যুবক অথবা মাঝবয়সী আবদুল লতিফ, মুখভর্তি দাড়ি নিয়ে হাজির হয়। আবদুল লতিফের বয়স নিয়ে জাহানারার এই বিভ্রম, আবদুল লতিফকে নিয়ে তার কৌতূহলের অবসান কখনোই ঘটে না।
জাহানারার বাপ কাসেম জব্বার তার হাঁটুর বয়সী আবদুল লতিফকে “বাপো হে” বলে জড়ায় ধরেন। কাসেম জব্বারের পাটের ব্যবসা ছিল, তাকে এখানে ওখানে ঘুরতে হত। কাসেম জব্বারের সাথে আবদুল লতিফের সাক্ষাতের সবটা জানে না জাহানারা। শুনেছিল আবদুল লতিফ নাকি হজ্জ্বে যাবার নিয়ত করে ঘর ছাড়া হয়েছিল। ঠিক করেছিল সংসারত্যাগী হবে। আর কাসেম জব্বার তখনকার চারহাজার টাকা একটা পুটলিতে নিয়া ঘুরছিল ব্যবসার কাজে, বড় একটা দাও মেরেছিল ব্যবসায়। তখনকার হিসাবে তো অনেক টাকা। তাই সে যখন গঞ্জে পুটলিটা হারিয়ে ফেলে সে ভেঙ্গে পড়ে খুব। তখন অপরিচিত আবদুল লতিফ, খুব বিবেচকের মতো খুঁজে বের করে টাকার মালিককে। কাসেম জব্বারের সাথে আবদুল লতিফের এই সূত্রে হৃদ্যতা হয়। কাসেম জব্বার জানতে পারে আবদুল লতিফ ঘর সংসারের উপর বীতশ্রদ্ধ, আল্লাহর রাহে যেতে চায়।
কাসেম জব্বারের মনে হয় এই অন্যরকম যুবকের ভালবাসতে পারার কোন জায়গা নাই বলেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া। বাকপটু কাসেম জব্বার, যুবকের অটল মনোভাবে খানিক দ্বিধা ঢুকিয়ে দেন। আর বলেন “আল্লাহর রাস্তায় যাওয়া লোকোক ফিরানোর সাহস নাই হামার, কিন্তু আল্লাহরই ইচ্ছায় যেমন তোমার এমন ইচ্ছা হইছে, আল্লাহর ইচ্ছায়ই তো অন্য ইচ্ছাও হইতে পারে, বাপো! তোমরা এমন একজন মানুষ, মনে থুইয়েন আল্লাহর তোমার মনোত পাপ ঢুকবার দিবার নয়। আর যদি আল্লাহর ইচ্ছায় তোমার ইচ্ছার বদল ঘটে, জয়রা মাজারের জব্বার দালালের বাড়ি সবাই চেনে”।
বছর না ঘুরতেই আবদুল লতিফ হাজির হয় জয়রামাজারে, কাসেম জব্বারের বাড়িতে। কাসেম জব্বারকে তার মত পরিবর্তনের কথা বলে। সে জানায় কাসেম জব্বার তাকে বিয়ের জন্য কোন মেয়ের সন্ধান দিতে পারে কি না। কাসেম জব্বার প্রস্তুতই ছিলেন। তিনি এই যুবককে তার কনিষ্ঠ কন্যার স্বামী হিসেবেই চিন্তা করেছিলেন।
কাসেম জব্বারের ইচ্ছা ছিল জামাই তার মেয়েকে নিয়ে তার আশেপাশেই থাকুক। কিন্তু স্বাধীনচেতা মৃদুভাষী আবদুল লতিফ এই প্রস্তাবে ঘন ঘন মাথা নাড়ায়। আবদুল লতিফ শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রায় ছয় সাত মাইল দূরে কয়েক একর উঁচু জমির মালিক হয়। সেখানে আগে কেউ চাষের চেষ্টা করে নাই। মাটি শক্ত। ঘরবাড়ি অনেক দূরে দূরে। একটা কবরস্থান ছিল কাছেই।
জাহানারার স্বামীর সাথে একঘরে থাকার বয়স ছিল না তখন। আবদুল লতিফ জাহানারার জন্য বাড়ি বানাতে গিয়ে রীতিমত একটা গ্রামই পত্তন করে ফেলে। প্রায় পঁচিশ জন কামলাকে নিয়ে টানা দুইবছর এই জায়গাটা সে বাসযোগ্য করছে। বাড়ি করছে, গোলা, গোয়াল ঘর আর পুকুর করছে। চাষের জমি করছে। আবদুল লতিফের ব্যাপারে কাসেম জব্বারের ধারনাটা ঠিক প্রমাণ হয়- যুবকের ভালবাসতে পারার মত কিছু ছিল না এতদিন। কামলারা গ্রামে ফিরে কাসেম জব্বারের কাছে তার মেয়ে জামাইয়ের পরিশ্রমের প্রশংসা করে। তার সৃষ্টিশীলতা আলোচনার বিষয় হয়। জাহানারার বিরক্ত লাগে। তার সামনে তার স্বামীর প্রশংসায় যে তারও প্রশংসা হয় সে সেটা বুঝতে পারে না- আবদুল লতিফ তার দখলের কিছু সেটা জাহানারা তখন বোঝে নাই। আবদুল লতিফ দুই তিনদিন পর জাহানারাকে দেখতে আসলে জাহানারার দায়িত্ব পড়ে আবদুল লতিফকে খাবার পরিবেশনের। দাড়িতে একটুও খাবার না লাগিয়ে আবদুল লতিফ কীভাবে খায় সেটা জাহানারার কাছে বিস্ময়ের। তাই আবদুল লতিফ কোথাও খাবার না লাগিয়ে খাওয়া শেষ করলে জাহানারা ব্যাপারটা আবার পরখ করতে চায়। বলে “দাড়িয়া আর একনা ভাত নেমেন?” আবদুল লতিফ হাসে। এটাই তার একমাত্র অভিব্যাক্তি যেইটা জাহানারা বুঝত।
আবদুল লতিফ জাহানারার জন্য বাড়িটা বানায় সেটা মাটি ফেলে ফেলে অনেক উঁচু করা। দুর্গের মত অনেকটা। বাড়ি ভিটার ভেতরেই পুকুর। কিন্তু অন্য বাড়িগুলো যেতে হলে ঢালু পথ পার হতে হয়। সেই পথটাও এমন যত্নে বানানো। উঠতে নামতে খুব একটা কষ্ট হয় না। জাহানারা বাড়িতে ঢুকেই অভিভূত হয়ে যায়। সংসার তার ভাললাগে। কিন্তু জাহানারার পরে মনে হয় আবদুল লতিফ তাকে ছেড়ে চলে যাবে বলেই এই দুর্গের মত নিরাপদ নিঃসঙ্গতা তৈরি করেছিল। নাহলে হঠাৎ কেন চলে যাবে আবদুল লতিফ আর একযুগ পর পায়ে পচন আর ক্ষয়রোগ নিয়ে ফিরবে?
৩
তিস্তা ভ্রষ্টা হয়ে কাসেম জব্বারের ঘুমন্ত গ্রামটাকে তার জিহ্বায় চেটে নিলে, তারপর এদিক ওদিক দাবড়াল জনবসতিগুলোকে। তারপর যেন অজগরের মত নিথর পড়ে রইলো। তখন জাহানারার বড় ছেলে ইদ্রিসের বয়স দেড় বছর। তিস্তার অরুচিতে গায়ে গতরে বাড়তে লাগল গোরস্তান। গ্রামের পর গ্রাম গোরস্তানের উদরে চলে গেলো। দুর্ভিক্ষ, মড়ক। রাত হলে শেয়ালের চিৎকারে কানে তালা লেগে যেত। শেয়ালগুলো বাড়ির উঠানে আসতে লাগল। মানুষ দেখলে এমন নিশ্চিত চোখে থাকত যেন তারা জানে তাদের খাবারে পরিণত হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।
এমনই কোন রাতে আঙ্গিনায় শেয়ালদের হুটোপুটি লেগে গেল, যেন শেয়ালরা ঘরের বেড়া ভেঙ্গে ঢুকে পড়বে ভেতরে। জাহানারা ইদ্রিসকে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে কাঁপতে থাকে। আবদুল লতিফ কী জানি চিন্তা করে উঠে দরজার দিকে আগায়। জাহানারা ভয় পেলেও স্বামীকে নিরস্ত করতে পারে না। দরজা খুললে শেয়ালগুলো একটু থামে, আবদুল লতিফ একটু হাঁকডাক দেয়, শেয়ালরা জায়গায় দাঁড়ায় থাকে। যেন তারা আবদুল লতিফের জীবন্ত অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে। থাকতে থাকতে একটা শেয়াল আবদুল লতিফের দিকে ছুটে আসে, আবদুল লতিফ তার গায়ের চাদর খুলে ছুটন্ত শেয়ালটাকে বেঁধে ফেলে সজোড়ে আছাড় মারে। তার কণ্ঠের খুনে উল্লাস জাগিয়ে দেয় গোটা গ্রামকে। ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়ে মানুষ। লাঠিসোঠা নিয়ে। গোটা জনপদ যেন অস্তিত্বের লড়াইয়ের অনিবার্য মীমাংসার একটা মহড়া শুরু হয়। শেয়ালের গর্তগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়, পিটিয়ে মারে। শেয়ালের চিৎকার আর মানুষের উল্লাসে কেঁপে কেঁপে ভোর হয় কালো রাত।
আবদুল লতিফ ঘরে ফিরে আসে, তার স্পর্শে জাহানারার নারীত্বের সমস্ত সংবেদন শরীর ও মনে শেকড় ছড়াতে থাকে। তারপর জাহানারা অস্তিত্বের সমস্ত পথ খুলতে না খুলতেই আবদুল লতিফ গ্রামের আরো তিনজনকে নিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা করে। যাবার আগে বলে “জাহান, যা কিছু রাখতেছি তা আমানত জানবা- তোমার জন্য বছর খানেকের খোরাক রাখতেছি গোলায়, দিয়া থুয়া খাইয়ো, আত্মাকে কষ্ট দিও না, দিন ফিরবে আবার”
জাহানার কী বলবে? “দাড়িয়া, হামাকও নেন সাথে” তা কি বলা উচিৎ ছিল জাহানারার? জাহানারা আবদুল লতিফের দ্বিতীয় পুত্র আনিসকে গর্ভে নিয়ে এই আম গাছটার সাথে বোঝাপড়া করে। তার প্রথম যৌবনে স্বামীর এমন চলে যাওয়াকে সে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে নেয়। তার মনে হয় তার ছেলেমানুষী আবদুল লতিফকে সংসার উদাসীন বানিয়েছে।
ছয়মাস পর আবদুল লতিফের সাথে যাওয়া বাকি তিনজন ফিরে আসে। আবদুল লতিফ আসে না। জাহানারা তাদের কাছে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে, সদুত্তর পায় না। জাহানার জানতে চায় আবদুল লতিফ বেঁচে আছে কি না। যদি বেঁচে না থাকে তাহলে সে বৈধব্য ধারণ করবে। তখন একজন জানায় “ভাইয়ো বাঁচি আছে- তোমরা এমন না করেন”। ধীরে ধীরে জাহানারা জানতে পারে আবদুল লতিফ হুলিয়া নিয়ে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। গোরা পুলিশেরা তাকে দেখলেই মেরে ফেলবে। এর থেকে কী মরে যাবার খবরই ভালো ছিল না? জাহানারা তো প্রতিদিন জানছে যে আজকে আবদুল লতিফ মারা গেলো, কিংবা গতকালকে মারা গিয়েছে।
আনিস বেড়ে উঠে তার পিতার আদলে, আবদুল লতিফের মত সংযত মৃদুভাষী সাবলীল এক কিশোর সংস্করণ। আনিসের পাগুলো শস্যের মাঝবয়সী সবুজ-ছোঁয়া জীবনের মত আপাত ভঙ্গুর অথচ ছান্দসিক দোলায় জীবনসংক্রমণ করে রুক্ষমাটিতে। একদিন মৃদু গলায় মাকে বলে বাবার আগমনের জন্য প্রস্তুত হতে। একযুগের প্রতীক্ষা যখন অভ্যাস হয়ে যায় জাহানারার, তখন আনিসের- যে কখনো বাবাকে দেখেনি, তার এমন কথায় বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোন পার্থক্য থাকে না জাহানারার কাছে।
আর সত্যি সত্যি আব্দুর লতিফ তার সাদা-পাকা দাড়ি নিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ায়।পায়ে পচন আর বুকে ক্ষয় রোগ, অথচ তেমনই মৃদু হাসি, যেটা তার একমাত্র ব্যক্ত-অভিব্যক্তি।
আনিস আব্দুর লতিফের পাশে বসে থাকে, আর আবদুল লতিফ যেন একটু একটু করে নিজে ছেলের ভেতরে ঢুকে যেতে থাকে। বাপ বেটা অনেক গল্প করে। ইদ্রিস বাপের পাশে তেমন যায় না, বড় ছেলের লঘু স্বভাব আবদুল লতিফকে টানেনা। সে আনিসের কাছেই হস্তান্তরিত হয়, আর মাঝে মাঝে জাহানারার দিকে তাকিয়ে সেই মৃদু হাসিটা হাসে।
আব্দুর লতিফ আর বছর দেড়েক বাঁচে, শেষ দিকে জাহানারার কাছে অনুযোগ করে, সে কেন আর তাকে “দাড়িয়া” বলে না।
এবং ঐ দেড় বছর যেন সে বেঁচেছিল কেবল পুরোটাই আনিসে সংক্রমিত হবার জন্য, বাবার মৃত্যুর পর সেই মৃদু হাসিটা আনিসের ঠোঁটে ভর করে।
৪
ইদ্রিস খুব চপলমনা, যাত্রার দলের সাথে ঘোরে, রংবেরঙের কাপড় পরে, পানের পিকে ঠোঁট লাল করে রাখে। সে যখন সেতারাকে বিয়ে করে আনে- সেতারা তখন ষোড়শী। সেতারাকে নিয়ে প্রথম প্রথম ইদ্রিসের মাতামাতি জাহানারাকে এমন এক হীনমন্যতায় ঠেলে দেয়, তার মনে হতে থাকে তার নারীত্বের কোন ঘাটতির কারণেই আবদুল লতিফ থিতু হয় নাই, সে ইদ্রিস আর সেতারার বন্ধ ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ আর অভিশাপ দেয় । অবশ্য ইদ্রিসের সেতারাকে নিয়ে আগ্রহ শেষ হয়ে যায় একসময়। আবার যাত্রার দলের পেছনে যায়, রক্তে খারাপ অসুখ নিয়ে ফিরে খুব কোঁকায়, আবার একটু সুস্থ হলে আবার গঞ্জের খারাপ মেয়েদের কাছে যায়, নেশা ভাং করে।
সেতারা একদিন দ্বিধাজড়ানো পায়ে আনিসের সামনে দাঁড়ায়, সেতারা আসার পর দেড় বছর হয়ে গেলেও আনিসের সাথে তার কোনরকম কথাটথা হয় নাই, যদিও সেতারার চোখ প্রথম থেকেই অনুসরণ করতো আনিসকে। কোন সম্বোধন না করেই সেতারা স্বামীর অনুজকে জানায় তার বাপের বাড়িতে একটা খবর নিতে, তারা কেমন আছে, কি করছে! সেই থেকে তাদের কথা শুরু।
গোরস্তান আবার নড়াচড়া দেবার আগে আনিসও সেতারার প্রতি তার অনুরাগটা টের পায় না।
দুর্ভিক্ষ আর মড়ক নামলে শেয়ালদের আবির্ভাব শুরু হয়, মৃতজীবিদের চিৎকারে কানে তালা লাগে, আর আনিস হাতে মশাল জ্বালিয়ে শেয়ালদের আস্তানায় আগুন লাগিয়ে দেয়, গোটা জনপদ আবার জাগে। তাড়িয়ে দেয় শেয়ালগুলোকে।
আর কোলাহলে ভোর নামলে সেতারার দরজা বাহিরের মৃদু ছোঁয়ায় উন্মুক্ত হয়, যেহেতু সেটা খোলাই ছিল, প্রতীক্ষার মত।আর সেতারার সমস্ত জানালা উন্মুক্ত হবার আগেই আনিস নিরুদ্দেশ হয়।
আনিসের এই প্রস্থানের পর, সেতারার প্রতি জাহানারা সহানুভূতিতে আর্দ্র হয় বলে “এরা এমনই মা- তুইও পারলু না”।
যদিও ইদ্রিস ফিরে ফিরে আসে, অসুখ সহনীয় হলে আবার ফিরে যায়। কিন্তু আনিস ফেরেনা, জাহানারা সান্ত্বনা দেয় সেতারাকে, কিংবা জাহানারা আসলেই নিশ্চিত থাকে, আবদুল লতিফ যেমন আনিসে সংক্রমিত হতে ফিরে আসছিল, আনিসও সেই প্রয়োজনেই ফিরে আসবে।
সেতারাকে যখন তার ছেলে দাদীর আশু মৃত্যুর ঘোষণা দেয়, সে তার ছেলের হাতধরে আমগাছের তলায় যায়, চাঁদটা তখন তার বরফ হয়ে যাওয়া পূর্নিমাকে আরো নিবিরভাবে গুটিয়ে নিয়েছে।
মৃত জাহানারার দেহের পাশে বসে, ছেলেটা আর তার মা প্রতীক্ষা করে। ছেলের প্রসারিত আঙ্গুল অনুসরণ করে সেতারা দেখতে পায় ক্রমশ একটা চেনা, বহুপ্রত্যাশিত ছায়ামূর্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠছে।