শহরটা কুয়াশাগ্রস্থ হইলে, সোডিয়াম লাইট এক বিবর্ণ ধূসর মেরুন রং লেপ্টে দেয় তার রাস্তাগুলাতে। সারাদিন অবিশ্রাম ঝিমুনি, রিক্সার টিং টিং আর চঞ্চল বাইকের বখাটেপনায় খালাসিপট্টীর সর্বংসহা বেশ্যার মত ব্যস্ত রাতের রাস্তা সাধারণ পরিবহন পাঁচটনী ট্রাকের হটাৎ ভারী চলাচল উরু পেতে সামলাইতেছে- হাঁপাইতে হাঁপাইতে।
পাশেই পাবলিক লাইব্রেরী, নাটক পাড়া আর শহীদ মিনার। ছোপ ছোপ সস্তা পাউডারের মত ঐখানে ফিকে, আলো আর অন্ধকারও। একটা ষাইট অথবা আশি ওয়াটের বাল্ব, পান খাওয়া এবড়োথেবড়ো দাঁতের মত লালচে ইলেকট্রিক তারের সাথে লটকায় আছে, তার হলদেটে আলো যেন কুয়াশারা চাদরে খানিক তালি ছাপ্পা মেরে দিছে।
“শালা হিরুইঞ্চি মাগীর ছেলেদের জন্য যদি একটাও লাইট ভাল থাকে”- এইরকম অভিযোগ শোনা যায় নিয়মিত। এইরকম অভিযোগ শোনার সময় প্রেমিকদের খানিক উশখুশ অস্বস্তিবোধ করতে দেখা যায়, যেহেতু তারাই লাইটগুলা ভাঙ্গে প্রাইভেসিবোধ থিকা। এইতো কয়দিন আগেও চম্পার যখন বিয়া হয় নাই বিপুলের সাথে তো এইখানেই বসত, একটু আলো থাকলে হাতানো দূর, হাতও ধরতে দিতনা। সুতরাং বিপুল লাইট ভাঙ্গতে পারে। আজকেই লাগানো হইছে লাইটটা- গতকাল এর থেকে ঘন কুয়াশায় আর অন্ধকারে নোমান আর যূথী বসা ছিল। অন্যসময় হইলে বিপুল নির্ভুল লক্ষ্যভেদে ভাঙ্গত কোন দুরূহ আড়াল থিকা। আজকে তার ভাঙ্গার সাহস নাই।
ডিসেম্বরের শীতে এই শহরে রাত নয়টায় বেশ রাত হয়। গাছ থিকা টুপটাপ শিশির ঝরার শব্দও শুনতেছে বিপুল। আর হটাৎ রাস্তায় ট্রাকের হর্নের ভোঁতা শব্দ শহরের ক্ষয়িষ্ণু নোনা দেয়ালে আলোড়ন তোলার ব্যর্থতায় সচেতন প্রতিধ্বনি তুলতে থাকে বিপুলের কানে।
“শালার খয়বার, দোকান বন্ধ কইরবার নয়, নাকি?”
খয়বার দোকান বন্ধ করবে কি না ক্রমশ পরিবর্তিত হইতে হইতে কেন খয়বার দোকান বন্ধ করবে না? বিপুলের মামুলি স্বগতোক্তি এমন দাবির ওজন নিয়া দাঁড়ায়। অথচ প্রায় একশো গজ দূরে চায়ের জন্য হাঁড়িতে দুধ জ্বাল দেয়া আগুনের দীপ্তিতে কুয়াশায় জড়ায় জড়ায় এমনেতেই নিথর প্রায় ম্রিয়মাণ। অথচ তার চোখ জ্বালা করতেছে।
সন্ধ্যার সময় বেটে এনিজিও আরিফ তার নববধূ চম্পাকে তার ভেসপার পিছনে বসায় টাউন হলে ঢুকছিল। বিপুল বসা ছিল “অগ্নি” নাট্যগোষ্ঠীর সোহেলের সাথে। চম্পাকে নিয়াই কথা বলতেছিল তারা। সোহেলের বাড়ির পাশে চম্পাদের বাড়ি, দুই একটা সান্ত্বনার কথা বইলা সে বিপুলের কাছে জিজ্ঞাসা রাখে, বিপুল সাধ মিটায় নিতে পারছে কি না। বিপুল তার পিছনের পকেটে সেফটিপিনের অস্তিত্ব টের পায়। আরিফের সাথে চম্পার বিয়ার কথা শুইনা বিপুল চম্পারে শহীদ মিনারের পিছনের অন্ধকারে নিয়া যায়, ইচ্ছামত শরীর চটকায়। চম্পা আটকায় না। কথাও বলে না। বিপুলের টানাটানিতে চম্পার সালোয়ারের ফিতা একপাশে ভেতরে ঢুইকা যায়। চম্পা অনেক চেষ্টা করেও সেইটারে ঠিক করতে পারে না। পিঠ ফুলায় কানতে থাকে। বিপুলের অসহায় লাগে। বিপুল একটা সেফটিপিনের জন্য তার নাট্যদলের ঘরে যায়, দেখে তালা বন্ধ। এইদিক ঐদিক ছোটাছুটি কইরা যখন সে একটা সেফটিপিন পায়, আইসা দেখে চম্পা চইলা গেছে। বিপুলের অনুশোচনা হইছিল।
তো আজকে আরিফ বিপুলরে অকারণ শাসায়- চম্পারে নিয়া নাকি বিপুল আজেবাজে কথা ছড়াইতেছে। বিপুল প্রতিবাদ করতে পারে না, চম্পারে দেইখা তার বুকে মোচড় দেয়। তার গলা ধইরা আসে। চুপচাপ দাঁড়ায় থাকলে আরিফ আরও জোর পায়, তেড়ে আসে। এইসময় চম্পা মাঝে আইসা দাঁড়ায় স্বামীরে সামলাইতে। বিপুলের দিকে তাকায়ও না। এতটা অবহেলা! বিপুল আবার ঘটনাটা ভাবতে যাইয়া কিছু দৃশ্য মনে মনে যোগ করে। একবার ভাবে সেও আরিফরে পালটা ধাক্কা মারলে আরিফ পইড়া যাইতে লাগছিল, আর চম্পা আরিফরে পইড়া যাওয়া থিকা বাঁচাইতে আরিফরে ধরছে। কিন্তু বিপুল তৃপ্তি পায় না। এবার সে ভাবে, মাঝে দাঁড়ানোর সময় চম্পার থিকা প্রায় আধ হাত খাটো আরিফের নাক চম্পার বুক ঘষা খাইছিল। আরিফ চম্পার স্পর্শে পোষ মাইনা গেছে, কিন্তু বিপুল রাগলে চম্পা কতবার বিপুলের হাতের কাছে নিজের বুকরে সমর্পন করছে, আহ্বান করছে- অথচ বিপুলের টনটনে অভিমান এতো সহজে তো পোষ মানে নাই। এই চিন্তা তারে উৎফুল্ল করে। বেপরোয়া বানায়। যেন আলো বিবর্জিত কুয়াশার ভেতর তার যে লুকায় থাকা, সেটা না ঘটা কোন ঘটনামাত্র। সে শীষ দিতে যায়, ঠোঁট গোল করে, কিন্তু তীব্র শীত তার ঠোঁটরে বেপরোয়া হওয়াটা উৎযাপন করতে দেয় না।
১৪-১৫ বছরের কিশোরী তখন চম্পা, নাকের নিচে হালকা লোমের রেখা, পোশাকের শাসনে অস্ফুট স্তন- নাট্য দলে নাম লেখাইলো। বিপুল আগ্রহ দেখায় নাই। বিপুল তখন থিকাই রীতিমত স্টার, সব নাটকে মেইন ক্যারেক্টার করে- অন্য নাটকের গ্রুপ তারে ভাগায় নিতে চায় । নাটক গ্রুপের মেয়েরা বিপুলের সাথে ঘুরতে চাইত। বিপুল শিল্পী আর হিন্দু হওয়ায় মেয়েদের ধারনা ছিল সে দুধভাত- ছেলেরাও তারে প্রতিযোগী ভাবে না। বিপুলের ফর্সা ক্লিন শেভড নীলাভ গাল টানা চোখ মেয়েদের তখন টানত বেশি। তখনো টাউন হলের নিয়ন্ত্রণ ছিল শিল্পী টাইপ লোকজনের হাতে। পরে নাটক পাড়ায় বেশ সুন্দরী মেয়েরা আসলে ঢাকা থিকা নিয়মিত সাহিত্য সংগঠন করা বুদ্ধিজীবীরা আসতে শুরু করে। টিভি আর সিনেমায় কাজ করা লোকজনও আসতে লাগল। সিনেমার লোকজন আসার আগে লোকজনের মনে হইতো বিপুলরে কোন পরিচালক দেখলেই তার সিনেমায় সাইন করাবে। কিন্তু করায় না। অনেকে বিপুলরে এরে ওরে ধরতে বলে, বিপুলের ইচ্ছা হয় না।
বিপুল সেই সময় নাটক পাড়ার চল্লিশ উর্ধ্ব প্রভাবশালী এক নারীর ভাড়া খাটত। প্রথম প্রথম বিপুলের সব কিছুই ভাল চলতেছিল। বিপুলের শেষের দিককার অভিজ্ঞতা খুব বাজে ছিল। প্রথম প্রথম শারীরিক সম্পর্কগুলা বিপুলের ভাল লাগত। পরে মহিলা বিপুলের সাথে এমন ভাব নিয়া শুরু করল যেন তার চরিত্রহীন স্বামীর প্রতি বদলা নিতেই সে জোর কইরা শোয়। অর্গাজম হওয়ার পর সে হাউমাউ কইরা কানতে কানতে বলত “আমি পারছি তোমার মত একটা চরিত্রহীন হইতে” কিংবা “মা তোমার মেয়েকে ক্ষমা করো, একটা হিন্দু ছেলেকে শরীর দিলাম”। একসময় মহিলার অর্গাজম অনিয়মিত হওয়া শুরু হইলো। মহিলার আগ্রহ কইমা গেলো, কিন্তু বিপুলরে তারপরও নিয়মিত ডাকত। একদিন বিপুল টিস্যু বক্স পাশে না নিয়া উপগত হওয়ায় ভারী তরল বেডশিটে লিক করছিল- মহিলা তারে অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল দিয়া মাথায় গালে মারে। বিপুলের খুব অপমান লাগছিল। তাই পালায় পালায় ছিল মাসখানেক। মহিলা আবার এরই মাঝে টাউনহলে কার সাথে জানি আলুথালু অবস্থায় ধরাও পরছিল। পরে উনি শহর ছাইড়া চইলা যান। বিপুলের বিরহের মত একটা অনুভূতি হইছিল। চম্পা সেই সময়টাতে নাট্যদলে আসে।
চম্পার মা মারা গেছিল, বাপে খালাকে বিয়া করছিল পরে। ট্র্যাক স্ট্যান্ড মোড়ে দুইতলা বাসা। বাপের তিন চাইরটা ট্রাক, পৌর মার্কেটে একটা মাছের আড়তও আছে। ওর থেকে দুইবছরের বড় একটা ভাই ছিল, গুণ্ডামত। মাঝে মাঝে বাপের উপর চিল্লাচিল্লি কইরা চম্পারে বেশ মাইরধোর করত। চম্পার চেহারার জৌলুস তার পরিপার্শ্ব প্রভাবিত বয়সের কারণে ঠিক ফুইটা উঠতে পারে নাই।
বিপুলের প্রতি আকর্ষনই চম্পারে সুন্দর হইতে উদ্বুদ্ধ করে।
একদিন সে ওড়না কায়দা কইরা ঝুলায় বিপুলরে ডাকে
-বিপুল’দা ক্ষিদা লাগছে
বিপুল তখন প্রথম লক্ষ্য করে কথা বলার সময় চম্পার উপরের ঠোঁট ভাঁজ হয়ে মাড়ি দেখা যায়। বিপুলের দেখতে খুব ভালো লাগে।
বিপুল তারে খাইতে নিয়া যায়। বিপুল প্রতীক্ষা করে কিশোরী মেয়েদের স্বভাব অনুযায়ী বিপুলরে চম্পা গরুর মাংসের ভয় দেখাবে। কিন্তু চম্পা তা করে না। চম্পা খাবারের দোকানের কাছে যাইয়া বলে
“চাংপাই চলেন, চাইনিজ খাই”
বিপুল আমতা আমতা করলে চম্পা বলে
“আমার কাছে টাকা আছে, আমার সাথে প্রেম করলে টাকা খরচ হবে না আপনার”
এক নিঃশ্বাসে বইলা ফেলে চম্পা। তার গাল উত্তেজনায় থিরথির কাঁপে। বিপুল তার সাথে সারাদিন ঘোরে। বিপুলরে ছয়শো টাকা দিয়া একটা শার্ট কিনে দেয়।
তারপর বিপুলরে জিজ্ঞেস করে “ঐ বুড়িটার সাথে আপনার যোগাযোগ নাই তো আর?”
বিপুল হকচকায় যায়।
চম্পা বলে “সে আপনেরে টাকা দিত?”
বিপুল বলে “আরে নাহ, ঐরকম কিছু না”
“আমি দিব, আপনে আমার সাথে প্রেম করবেন”

চম্পার গুণ্ডা ভাইটারে বাপে সামলাইতে না পাইরা স্পেন না ইতালিতে পাঠায় দেয়। চম্পা তখন খাপ ভাইঙ্গা বাইর হওয়া ছোরার মত দ্যুতি ছড়ায়। তার ধনুকের মত ঠোঁটে হাসি ঝিলিক মারে। বগলে বই নিয়া গান গাইতে অভিনয় করতে না পারা লোকজন চিনু আচেবের বই সাধে, শাকিরার গানের সিডি দেয়। একজন লিটলম্যাগে চম্পার একটা কবিতাও ছাইপা দেয়। বিপুল হিংসা করলে চম্পার আনন্দ হয়। অন্ধকারে চম্পা বিপুলের অভিমানের সাথে ছলাকলা করে, নতুন কাপড় চোপড় কিইনা দেয়, একটা গীটারও কিইনা দিছিল। তাদের অনেক কথাই হইতো, কিন্তু নিজেদের বিয়ার কথা হয় নাই। বিপুল ভাবছিল চম্পা এই শহরের বাইরের কাউরে বিয়া করবে। কোন ইউনিভার্সিটি কিংবা কলেজ মাস্টাররে অথবা সরকারি ইঞ্জিনিয়াররে। প্রেমিকার হবু স্বামী নিয়া তার উচ্চাশা ছিল। কিন্তু চম্পা আরিফরে বিয়া কইরা বিপুলরে একটা আফসোসে ফেলে দেয়। বিপুল আরিফের যোগ্যতর বিকল্প ছিল নিঃসন্দেহে। বিপুল তো ধর্ম চেঞ্জ কইরা ফেললেই হয়। বিপুলও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পাশ। নাটক ফাটক ছাইড়া দিলে কিছু একটা কাজ তো খুইজা নিতে পারে, আবার বাজারে ওদের যে দোকান আছে ভাড়া দেয়া সেইটাই সে ব্যবসা খুইলাও বসতে পারে। তার উপরে নিজের বাড়িও আছে বিপুলের।
অন্ধকারে বিপুলের স্মৃতিতে শান দেয় চম্পার মাড়ি, দাঁতের গোড়ায় আর মাড়ির অমীমাংসিত সীমান্তে লাইগা থাকে লালার বুদ্বুদ। এই স্মৃতির নড়াচড়া বিপুলকে উত্তাপ দেয়। তলপেটের চাপ তাকে পেশাবের প্রয়োজনে দাঁড় করায়। আর সব পুরুষের মত উত্থিত শিশ্ন তারে গর্বিত করে।
দেয়ালের যেই জায়গাটায় সে প্রস্রাব করার জন্য দাঁড়ায়, তাতে লেখা ছিল “জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস” সেইটারে চ্যালেঞ্জ কইরা লেখা ছিল “বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস”, কুয়াশা আর অন্ধকারে ঢাকা দেয়ালে জিপার খুলতে খুলতে ক্ষমতার আর এক উৎসের সন্ধান করে। এতক্ষণ চাইপা রাখার কারণেও হইতে পারে আবার অতি দ্রুত সংকোচন প্রসারণের কারণেও হইতে পারে, তার পেশাবের রাস্তা চিনচিন করে।
বিপুলের আর কিছুতেই কিছু হয় না। সে মাইনা নেয়, চম্পার জন্য তার আফসোস হয়। খয়বারের দোকানও বন্ধ হইয়া গেছে, সে চোরের মত সন্তর্পনে চত্বরগেট দিয়া বাইর হইয়া রাস্তায় ওঠে। ট্রাকের চলাচল কইমা আসলেও, বহুদূরে থিকা ট্রাকের আসার আওয়াজ পাওয়া যাইতেছে। সোডিয়াম লাইটগুলার গ্লাসে শিশির জইমা আছে, আর ঘোলাটে আলো তাতে যন্ত্রণা তৈরি করছে।
বিপুলের বাপ মা বাইচা নাই। ওর বাপের স্বর্ণের দোকান ছিল। বড় ভাই ব্যবসা গুটায় যশোর চইলা গেছে। চাইলে টাকা পাঠায়। কিন্তু সে চাওয়া কমায় দিছে। ভাড়াটিয়ারা ভাড়া ঠিকঠাকমত দেয় না। চম্পার বিয়ার পর হাতখরচ নিয়া সে চিন্তায় পইড়া যায়। তার ভাইকে শঠ মনে হয়, তারে এমন নির্মম একটা জায়গায় রাইখা, দখলের ঘুঁটি বানায় ভাই তার দূরে চইলা গেছে। মেইন রোড ছাইরা মোড় নিলে বিপুলের ছায়াও হারায় গেলে বিপুল দুনিয়া থিকা আলাদা হইয়া পড়ে। তার যেন কী মনে হইতে যাইয়াও আর মনে পরে না কয়েক মুহূর্ত।
বাড়ির গলির সামনে নেশাখোরদের জটলা। গৃহহীন কেউ কেউ কাগজ, পলিথিন জড়ো কইরা আগুন জ্বালছে। থাইকা থাইকা পটপট কইরা শব্দ করতেছে আগুন। রাত কয়টা? এগারোটা? গোলাপীর তীক্ষ্ণ হাসির শব্দে বিপুলের শরীর ঝমঝম করে।
গোলাপী বিপুলের বাড়ির সামনে একটা ছাপড়া ঘরে থাকে। রাস্তার জন্য বিপুলের বাপ যে দুইশতক জমি ছাড়ছিল সেই জমিতে। বিপুলের জানালা দিয়া তাকাইলে গোলাপীর ঘরের ভেতরটা দেখা যায়, গোলাপীর উদ্ধত গ্রীবা আর ভারী বুক- চোখে চোখ পড়লে বিপুল চোখ না নামায় নেয়া পর্যন্ত গোলাপী তাকায় থাকে, বিপুল চোখ নামাইলে গোলাপী একটা জিইতা যাওয়ার হাসি হাসে, বিপুল সেইটা দেখার জন্য আবার চোখ তুলতে পারে না- চম্পার জন্য। চম্পার সাথে প্রেম থাকাকালীন বিপুল এই সততা মেইনটেইন করছে। তাই বিপুলরে গোলাপীর ব্যাপারে উদাসীন থাকতে সচেতন চেষ্টা চালাইতে হয়।
গোলাপীর শরীর আর কণ্ঠ ভীষণ সরব। গোলাপীর বাপে ওর বাপের কর্মচারী ছিল। বিপুলের বাপ বাইচা থাকতেই গোলাপীর বাপে মারা গেছিল রোড এক্সিডেন্টে। গোলাপীর মায়ে সাহায্যের জন্য আসলে পরিস্থিতি বিবেচনা কইরা বাড়ির টুকটাক কাজের জন্য বাড়ির পাশেই থাকতে দেয় ওদের। বিপুলের মা তখন শয্যাশায়ী। গোলাপীর মা বেশিরভাগ সময় বিপুলের মায়ের ফরমায়েশ খাটত।
গোলাপীর ন্যাড়া মাথায় বিশ্রী রকম ফোঁড়া ছিল সারা বছর, তার উপরে সাদা পাউডার। ওদের বারান্দায় একটা মুড়ির বাটি নিয়া বইসা থাকত। বিপুল এই স্মৃতি দিয়া গোলাপীর এমন অনিবার্য উপস্থিতিরে নাকচ করছিল এতদিন। কিন্তু আজকে গোলাপী যখন তুমুল তাচ্ছিল্য নিয়া দাঁড়ায় ছিল গৃহহীন আর নেশাখোরদের মাঝে। বিপুলের স্বাভাবিক ডিফেন্স মেকানিজম- মাথায় ফোঁড়া থাকা শিশু দিয়া এক যুবতীরে প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া মাঝপথে বিকল হইয়া পড়ে। বিপুলের মাথার দখল নিয়া নেয় তার মায়ের শাড়ির আঁচল আর ট্রেনের শব্দ। অন্ধকারে ঝিলিক মাইরা মিলায় যাওয়া কথাটা তার মনে পড়ে। বিপুলের আর বাঁচার দরকার নাই। বিপুল আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিপুল গোলাপীর সাথে কথা বলার জন্য একটু দাঁড়ায়, আবার কী ভাইবা ঘরে চইলা যায়। তার মনে হইতে থাকে পিছনে তাকাইলে সে দেখবে গোলাপী তার দিকে তাকায় রইছে। বিপুল সিগারেট খায় না। সুযোগ পাইলে একটু মদ খায়। চম্পা টাকা দিলে রাইত জাইগা নাটক প্র্যাকটিসের জন্য সে বাসায় মদ নিয়া আসত। তার মদ খাইতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু পকেটে টাকা নাই। ঘরের চাইরদিকে তাকাইলে সে বেচার মত কিছু দেখে না। গীটারটা বেইচা দেয়ার কথা ভাবে। কে কিনবে? তার মইরা যাওয়ার দিন স্বচ্ছল ভাবে বাঁচার জন্য সে গোলাপীর পার্টটাইম পেশার উপর নির্ভর করে।
গোলাপী একটা এনজিওর ভ্যাসেকটমির সাফল্য-সহযোগী। এনজিও আপারা ঘরে ঘরে যাইয়া যেই মহিলাদের অনুরোধ করে স্বামীদের উদ্বুদ্ধ করতে তাতে বছর শেষে এনজিওর টালি সাজানোর মত সংখ্যা আসে না। গোলাপী বিভিন্ন মাদকাসক্তদের এই অপারেশনে নিয়া যায়। প্রথম প্রথম কাঁটাছেড়ার অপারেশন ছিল বইলা অনেক হুজ্জতি হইতো, লোকজন যাইতো কিন্তু সার্জারির ব্লেড দেখলে রাজি হইতো না। এইসব কাজে তো আর হাত পা বাইন্ধা করা যায় না। পরে জিনিসটা সহজ হওয়ায় এখন টাকার প্রয়োজনে এইটা শহরের মাদকাসক্তদের জন্য শেষ আশ্রয়।
রাতে আর ঘুম হয় নাই বিপুলের। অনেকক্ষণ জানালা দিয়া গোলাপীর ঘরের দিকে তাকায় ছিল। গোলাপীর ঘরে আলো ছিল না। বিপুলের হালকা তন্দ্রার মত আসছিল- এই ঘর থিকাই অনেকদিন আগে, যখন মা বাইচা ছিল আর গোলাপীর মা ঐ ঘরটায় ছিল- বিপুলরা কি ভুল দেখছিল যে তার বাপ ঐ দরজা দিয়া ভিতরে ঢুইকা গেছিল? বিপুল আর তার ভাই উত্তেজনা নিয়া বইসা ছিল। ঐ দিন সকালেই গোলাপীর মায়েরে বিপুলের বাবা বলছিল “আজকে ফিরতে ফিরতে রাত্তির হবে, তোর আসার দরকার নাই- আমিই বাড়িত আসার আগে যাব”।

বিপুলের বাবা বিশালদেহী সুদর্শন এক পুরুষ ছিলেন। কথা কম বলতেন। বিপুল দেখতে তার বাবার মত হলেও, বিপুলের বাবা তার দাদারেই বেশি আদর করতেন।

ভোরের আলোতে আর গোলাপীর কন্ঠে তন্দ্রা ছুইটা যায় বিপুলের। আয়নায় দেখে চোখ লাল। ভরপেট মদ আর ঘুমের ওষুধ খেয়ে ট্রেন লাইনে শুয়ে থাকবে সে। আজকেই শেষ দিন। আরিফের উপর রাগ থাকে, চম্পার উপর থাকে না। মায়ের কথা মনে হয়।
গোলাপীর সাথে চোখাচুখি হইলে সে গোলাপীরে ইশারা কইরা থামতে বলে। সিঁড়ি দিয়া নামে- মাসের বাইশ তারিখ আজকে, ভাড়াটিয়ারা এড়ায় চলে না তাই। লুঙ্গি পইরা আদাব দেয় একজন

“দাদার ঠিকানা জানেন না, বাড়িভাড়া ঐখানে মানিঅর্ডার করিয়েন কাকা”
“ক্যান কই যাবেন আপনে?”
ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠ ভাড়াটিয়ার, উদ্বেগ শোনা যায় যেন, তারপর খুঁটায় খুঁটায় বিপুলের দাদার খবর টবর নেয়, বিপুলের বিরক্ত লাগে। দুইমাস পর এরা একমাসের ভাড়া দেয়, এমনেই ভাড়া কম। বিপুল অনিচ্ছায় তাগাদা দেয়, নাইলে কবে যে দখল কইরা বসবে। চম্পায় বলছিল একটা উকিলের সাথে কথা বইলা রাখতে। বিপুলের মনে হয় এখন আর এইসব ভাইবা কী লাভ!
গোলাপীর সামনে দাঁড়ায় বিপুল অনুভব করে গোলাপীর ব্যাপারে আর তারে কোনরকম চেষ্টা চালাইতে হইতেছে না।
তুই কেমন কইরা জানি টাকা দিস হিরুইঞ্ছিদের
হিরুইঞ্চিদের কই দেই?
তাইলে?
দেই, যাদের টাকা লাগে
আমার লাগবে
আন্দাজি! মাথা খারাপ হইছে?
আমার লাগবে, তুই না নিয়া যাইস তো আরও লোকোক চিনি।
দাদা কী হইছে আপনের, চোখ ফোলা?
তুই নিয়া যাবি? অন্যদের চায়া টাকা বেশি দেবো এলা।
বড়লোকের ট্যাকা না থাকলেও ফুটানি কমে না, আমার টাকা ওরাই দেয়- আপনে দুইশো দিয়েন।
কখন যাবি?
গোলাপী চুপ থাকে, একটু মুচকি হাসেও হয়তো। বিপুল যাবেই বুইঝা বলে “আপনে একটু বসেন, আমার একটু কেরানীপাড়ায় কাজ আছে, ঐটা কইরা আসতেছি।“
বিপুল গোলাপীর ছাপড়া ঘরে বসে। রুমে একটা অদ্ভুত গন্ধ। বিছানা সুন্দর কইরা গোছান। বসার আলাদা কোন জায়গা নাই। বিছানায় বইসা থাকে, বইসা থাকতে থাকতে তার ঘুম পায়। সে ঘুমায় যায়। স্বপ্ন দেখে, ট্রেনে কইরা সে আর তার মা কোথায় জানি যাইতেছে। ট্রেনের লাইনম্যান নাই তাই তাদের একটা থাম্বার সাথে বাইধা রাখা হইছে। তার মায়ের লাল শাড়ি উড়তেছে। মাথায় ফোঁড়া নিয়া একটা মেয়ে ট্রেন থিকা মাথা বাইর কইরা দেখতেছে, সে ই নাকি লাইনম্যানের মেয়ে।
বিপুল মনে হয় অনেকক্ষণ ঘুমাইছে, উইঠা দেখে বিকাল। প্রথমে জায়গাটা চিনতে সমস্যা হয়। পরে গোলাপীরে দেইখা তার সব মনে পড়ে।
“তোকে মাসীর মতন দেখায়”
গোলাপী হাসে। কয় এখনো কি যাইতে চান? বিপুলের আত্মহত্যাস্পৃহাটা নইড়াচইড়া কইরা ওঠে।
বিপুলরা যখন বাইর হয় তখন বিকাল অনেকটা লালচে হইয়া আসে। গোলাপী অনেক কথা হয়, বিপুলের বাপের কথা কয়, মায়ের কথা কয় এমনকি বিপুলকে বিপুলদের বাড়ির বর্তমান ভাড়াটিয়া নিয়াও অভিযোগ করে।
বিপুল জিজ্ঞাসা করে “কয় টাকা দেয়রে?”
-আড়াই হাজার, লুঙ্গি না নিলে ছাব্বিশ শো।
লুঙ্গি দেয় শুইনা বিপুল হাসে। বিপুল না হাসলেও পারত, সে গোলাপীর মুগ্ধ চাহনিরে একটু আপ্লুত করতেই হাসে মনে হয়। গোলাপীর একটু অপমানও লাগে। বিপুলরে সে তো খানিক প্রশ্রয়ও দিতেছে, তাও বিপুল তার সিদ্ধান্ত পাল্টাইতেছে না। সে কিছু বলতেও আবার ভয় পায়। বিপুল এখন তো কথা বলতেছে- পরে সেইটাও বন্ধ করে দিলে? আর ব্যাপারটা এমন যে একটা পুরুষালি ব্যাপার নিয়া পুরুষের সঙ্গী হওয়াও তো আন্তরিকতার একটা শুরু।
একটা চিনচিনে ব্যথা আর কিছু অ্যান্টিবায়োটিক আর একসপ্তাহ সেক্স না করার উপদেশ নগদে নিয়া টাকার জন্য আধাঘন্টা অপেক্ষা করে বিপুলরা। টাকা হাতে পাওয়ার পর বিপুলের আর আত্মহত্যা করার ইচ্ছা হয় না।
বাইর হইয়া দেখে রাস্তায় আইসক্রিম বিক্রি করতেছে। গোলাপীরে তার সাধতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সে সাধে না। সে রিক্সা ডাকে পৌর বাজার যাবে বইলা। সে আর টাউন হলে যাবে না, নাটক করবে না। তাদের দোকানের খোঁজ খবর নিতে যাইতেছে সে।
গোলাপীরে চাইলে সে রিক্সায় আগায় দিতে পারে কিন্তু সে রিক্সায় উইঠা গোলাপীরে একটা পাঁচশো টাকার নোট দেয়।
গোলাপী জানায় তার কাছে খুচরা নাই। বিপুল বলে “বাসায় যাইয়া দিয়া আসিস”
তারপর গোলাপীর দিকে আবার তাকায়, বলে
“তোর আসার দরকার নাই, ফিরতে রাত হবে, আমিই আসবো- ডাকলে শুনিস”
গোলাপীর তখন থিকাই যেন প্রতীক্ষা শুরু হয়। বিপুল গালে হাত দিয়া ভাবে ফেরার পথে শেভ কইরা আসতে হবে।